অষ্টম শ্রেণীর ইতিহাস
প্রশ্নঃ মহলওয়ারি , রাওতওয়ারি ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্যে একটি তুলনামূলক আলোচনা কর।
ভূমিকাঃ
ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে রাজস্ব আদায়ের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা চালু করা হয়— চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত এবং মহলওয়ারি বন্দোবস্ত। এই তিনটি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য একই হলেও তাদের বৈশিষ্ট্য ও কার্যপ্রণালীর মধ্যে পার্থক্য ছিল।
১. প্রবর্তক ও প্রবর্তনের সময়কালঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তন করেন। রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত ১৮২০ সালে স্যার টমাস মনরো চালু করেন। মহলওয়ারি বন্দোবস্ত ১৮৩৩ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সময় কার্যকর হয়।
২. কার সঙ্গে বন্দোবস্ত করা হয়ঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারের সঙ্গে, রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে কৃষকের (রায়তের) সঙ্গে এবং মহলওয়ারি বন্দোবস্তে গ্রাম বা মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হতো।
৩. রাজস্ব নির্ধারণঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রাজস্ব চিরস্থায়ীভাবে নির্ধারিত ছিল। রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি বন্দোবস্তে নির্দিষ্ট সময় অন্তর রাজস্ব পুনর্নির্ধারণ করা হতো।
৪. জমির মালিকানাঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারকে জমির মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। রায়তওয়ারি বন্দোবস্তে কৃষককে এবং মহলওয়ারি বন্দোবস্তে গ্রামসমাজ বা মহলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৫. প্রচলিত অঞ্চলঃ
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায়, রায়তওয়ারি মাদ্রাজ ও বোম্বাই অঞ্চলে এবং মহলওয়ারি উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, পাঞ্জাব ও মধ্য ভারতের কিছু অঞ্চলে চালু ছিল।
উপসংহারঃ
চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি ও মহলওয়ারি বন্দোবস্তের মধ্যে নানা পার্থক্য থাকলেও তিনটিরই মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি। তবে এই ব্যবস্থাগুলির ফলে কৃষকদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ও শোষণ বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্নঃ মর্লে মিন্টো সংস্কার আইন সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লেখ।
ভূমিকাঃ
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের প্রশাসনে সীমিত অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯০৯ সালে মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন প্রবর্তন করে। তৎকালীন ভারতসচিব জন মর্লে এবং ভারতের বড়লাট লর্ড মিন্টো-এর নামে এই আইনের নামকরণ করা হয়।
মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনের বৈশিষ্ট্যঃ
আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধিঃ
এই আইনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। এর ফলে আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক ভারতীয় আইন পরিষদে প্রবেশের সুযোগ পায়। যদিও প্রকৃত ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের হাতেই ছিল।
২. নির্বাচনের ব্যবস্থাঃ
এই আইনের মাধ্যমে প্রথম পরোক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ছিল না। শুধুমাত্র জমিদার, ধনী ব্যক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় ও কিছু বিশেষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাই ভোট দিতে পারতেন।
৩. মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীঃ
মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত দিক ছিল মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী চালু করা। এর ফলে মুসলিম ভোটাররা শুধুমাত্র মুসলিম প্রার্থীকেই ভোট দিতে পারতেন। ব্রিটিশ সরকার এর মাধ্যমে 'বিভাজন করে শাসন' নীতি অনুসরণ করে।
৪. ভারতীয় সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিঃ
এই আইনের ফলে ভাইসরয়ের কার্যনির্বাহী পরিষদে প্রথমবার একজন ভারতীয় সদস্য নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ১৯০৯ সালে সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিনহা এই পরিষদের প্রথম ভারতীয় সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন। এটি ভারতীয়দের প্রশাসনিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
উপসংহারঃ
মর্লে-মিন্টো সংস্কার আইন ভারতীয়দের সীমিত রাজনৈতিক অধিকার ও প্রশাসনিক অংশগ্রহণের সুযোগ দিলেও প্রকৃত স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তবুও ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন, কারণ এটি পরবর্তী সাংবিধানিক সংস্কারের ভিত্তি রচনা করেছিল।
প্রশ্ন: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে কি সামন্ত বিদ্রোহ বলা যায়? তোমার উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দাও।
ভূমিকাঃ
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে সিপাহিদের পাশাপাশি বহু দেশীয় রাজা, নবাব, জমিদার ও তালুকদার অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাই ইতিহাসবিদদের একাংশ এই বিদ্রোহকে 'সামন্ত বিদ্রোহ' বলে অভিহিত করেছেন।এর পক্ষে যুক্তিগুলি হল—
১. দেশীয় রাজা ও সামন্তশ্রেণির নেতৃত্বঃ
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, নানাসাহেব, বেগম হাজরত মহল, কুয়ার সিংহ প্রমুখ দেশীয় রাজা ও সামন্ত নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিদ্রোহের পরিকল্পনা, পরিচালনা ও নেতৃত্বে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে এটি অনেকাংশেই সামন্তশ্রেণির আন্দোলন ছিল।
২. হারানো রাজ্য ও ক্ষমতা পুনরুদ্ধারঃ
লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি এবং কুশাসনের অজুহাতে ব্রিটিশরা বহু দেশীয় রাজ্য দখল করেছিল। ফলে অনেক রাজা-নবাব তাঁদের রাজ্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতা হারান। নিজেদের হারানো অধিকার ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যেই তাঁরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগ দেন।
৩. জমিদার ও তালুকদারদের অংশগ্রহণঃ
ব্রিটিশদের নতুন ভূমি-রাজস্ব নীতির ফলে বহু জমিদার ও তালুকদার তাঁদের জমি ও বিশেষ অধিকার হারান। বিশেষ করে অযোধ্যা অঞ্চলের বহু তালুকদার ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তাই এই বিদ্রোহে সামন্তশ্রেণির বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
৪. ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রাধান্যঃ
এই বিদ্রোহের প্রধান লক্ষ্য ছিল না সমগ্র ভারতকে স্বাধীন করা। অধিকাংশ সামন্ত নেতা নিজেদের রাজ্য, উপাধি ও ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। ফলে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে সামন্তশ্রেণির স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
উপসংহারঃ
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে সামন্তশ্রেণির নেতৃত্ব ও স্বার্থরক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই ইতিহাসবিদদের একাংশ একে 'সামন্ত বিদ্রোহ' বলে অভিহিত করেছেন। তবে এতে সিপাহি, কৃষক ও সাধারণ মানুষেরও অংশগ্রহণ ছিল, তাই অনেক আধুনিক ঐতিহাসিক একে শুধুমাত্র সামন্ত বিদ্রোহ না বলে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বা বহুমাত্রিক বিদ্রোহ হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন।
Comments
Post a Comment
Haven't doubt please let me know.