ভূগোল নবম শ্রেণী, তৃতীয় অধ্যায়

 প্রশ্নঃ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ আলোচনা করো। 

উত্তর ঃ নদী, ঝরনা, জলপ্রপাত ইত্যাদির প্রবাহমান জলধারার বেগে টারবাইন চাকা ঘুরিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাকে জলবিদ্যুৎ বলে। এই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কতগুলি অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ প্রয়োজন হয়। সেগুলি হল- 

A. প্রাকৃতিক পরিবেশঃ  

ক) বন্ধুর ভূপ্রকৃতিঃ উঁচু-নিচু বা বন্ধুর পার্বত্য অঞ্চল জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সহায়ক। এই ধরনের ভূপ্রকৃতির ওপর প্রবাহিত জলধারার বেগ বেশি হয় বলে টারবাইনের চাকার ঘূর্ণন বেশি হয়। ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সহজ হয়। এই কারণে পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চল গুলিতে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। 

খ) নিয়মিত ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতঃ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান ও প্রাথমিক শর্ত হলো নিয়মিত জল সরবরাহ। তাই ভূপৃষ্ঠের যেসব অঞ্চলে নিয়মিতভাবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয় সেই সব অঞ্চলে জল সরবরাহ অব্যাহত থাকে বলে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। 

গ) হিমাঙ্কের ওপর উষ্ণতাঃ জলের উষ্ণতা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলে জল জমে বরফে পরিণত হয়। তাই জলের গতিশীলতা থাকে না। তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জলে হিমাঙ্কের উপরে উষ্ণতা থাকা একান্ত প্রয়োজন।

ঘ) প্রাচীন শিলা গঠিত ভূ-ভাগঃ প্রাচীন ও কঠিন শিলা গঠিত অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীর উপর সহজেই বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। 

ঙ) বনভূমির অবস্থানঃ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বনভূমি পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। গভীর অরণ্য কেবলমাত্র বৃষ্টিপাতের পরিমাণই বৃদ্ধি করে না, জলস্রোতের গতিবেগকেও প্রতিহত করে মৃত্তিকা ক্ষয় রোধ করে। ফলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি পায়। 

B ) অর্থনৈতিক পরিবেশ 

ক) মূলধন সরবরাহঃ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও একবার উৎপাদন শুরু হয়ে গেলে আর কোন পৌনঃপুণিক ব্যয় নাই। তথাপি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদী বাঁধ নির্মাণ, ভারী যন্ত্রপাতি স্থাপন, বিদ্যুৎ পরিবহনের পরিকাঠামো নির্মাণ এবং ডায়নামোর সাহায্যে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন হয়। 

খ) উন্নত কারিগরি ব্যবস্থাঃ পার্বত্য অঞ্চলের খরস্রোতা নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপন অত্যন্ত কঠিন ও জটিল কাজ। তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য উন্নত ও দক্ষ কারিগরি ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।

গ) বহুমুখী নদী পরিকল্পনাঃ বহুমুখী নদী পরিকল্পনার মাধ্যমে কোন একটি অঞ্চলে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও থাই সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও ব্যবস্থা করা হয়। তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বহুমুখী নদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। 

ঘ) উন্নত পরিবহন ব্যবস্থাঃ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য অত্যন্ত দামি যন্ত্রপাতি নির্মাণ স্থলে নিয়ে যেতে হয় তাই উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। 

ঙ) সরকারি ব্যবস্থাপনাঃ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয় বেশি বলে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। তাই এইসব দেশগুলিতে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হলে সরকারি সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। 

প্রশ্নঃ জলবিদ্যুৎ এর সুবিধা গুলি আলোচনা করো।

উঃ) নদী, ঝরনা, জলপ্রপাত ইত্যাদির প্রবাহমান জলধারার বেগে টারবাইন চাকা ঘুরিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাকে জলবিদ্যুৎ বলে। এর কতগুলি সুবিধা হলো 

ক) প্রবাহমান সম্পদঃ জলবিদ্যুৎ একটি পুনর্ভব ও প্রবাহমান সম্পদ। তাই এই সম্পদ যতই ব্যবহার করা হোক না কেন নিঃশেষ হবার সম্ভাবনা নেই। 

খ) স্বল্প উৎপাদন ব্যয়ঃ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে পৌনঃপুনিক ব্যয় খুব কম। এই বিদ্যুৎ অপেক্ষাকৃত সস্তা।

গ) শ্রম শক্তিঃ প্রচলিত শক্তি সম্পদ শক্তিগুলি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না। 

ঘ) দূষণমুক্ত পরিবেশঃ জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদনের সময় ধোঁয়া, ছাই ইত্যাদি বায়ুদূষক পদার্থ উৎপন্ন হয় না। ফলে এই শক্তি ব্যবহারে পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকে। 

ঙ) সম্পদ সংরক্ষণঃ জলবিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার কয়লা, খনিজ তেল ইত্যাদি শক্তি সম্পদ সংরক্ষণে সাহায্য করে ।

চ) বিতরণ কেন্দ্রে প্রেরণঃ ট্রান্সমিটার ও লাইনের মাধ্যমে এই শক্তি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরণ করা যায়। 

প্রশ্নঃ ভারতের পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্র গুলির নাম লেখ।

উত্তরঃ বর্তমানে ভারতে সাতটি পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র আছে। সেগুলি হল - 

ক) মহারাষ্ট্র - তারাপুর 

খ) রাজস্থান - রাওয়াত ভাটা 

গ) তামিলনাড়ু - কালাপক্কম ও কুদানকুলাম 

ঘ) উত্তর প্রদেশ - নারোরা 

ঙ) গুজরাট - কাকড়াপাড়া 

প্রশ্নঃ ভারতের প্রধান প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলির নাম লেখ। 

উঃ ভারতের প্রধান প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলি হল- 

ক) উত্তর ভারত 

জম্মু ও কাশ্মীর- সালাল 

হিমাচল প্রদেশ- ভাকরা নাঙ্গাল 

উত্তর প্রদেশ- রিহান্দ 

খ) পূর্ব ভারত 

ঝাড়খন্ড- মাইথন 

উড়িষ্যা- হিরাকুদ 

পশ্চিমবঙ্গ- মেসেঞ্জার, তিস্তা জলঢাকা 

গ) পশ্চিম ভারত 

মহারাষ্ট্র - কয়না 

গুজরাট- সর্দার সরোবর প্রকল্প 

ঘ) দক্ষিণ ভারত 

অন্ধ্রপ্রদেশ - নাগার্জুন সাগর 

কর্ণাটক- শিব সমুদ্র 


Comments